গৃহবধূ

Published on 10 Jul 2026 Short Story


Cover for গৃহবধূ

“বাবু, বাবু! উঠে পড়, বেলা হয়ে গেছে।”

সকাল সকাল মায়ের হুকুম শুনে ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভেঙ্গে চোখ রাখলাম দেয়াল ঘড়ির দিকে। মোটে ভোর সাতটা! এই সাত সকালে কেউ ঘুম থেকে তোলে? তাও আবার নিখাদ একখানা ছুটির দিনে? এ যে মহা পাপ!

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়েছিলাম, এক পা কোলবালিশে তোলা। ওই পা-টাই মোটামুটিভাবে অবশ হয়ে গেছে। আমি অসহায়ভাবে চেষ্টা করলাম পাশ ফেরার, বিশেষ সুবিধা হল না।

“বাবু! উঠেছিস? বাবু?” আবার হাঁক দিল মা।

একশ বার বলেছি ছুটির দিনে আমাকে না ডাকতে। আজ হঠাৎ কোন ভূমিকম্প হল তাই ভাবছি। পাশ ফিরতে গিয়ে ঘাড়ে টান লেগেছে, ব্যাথায় এ মুহূর্তে স্মৃতি কাজ করছে না। এসব ক্ষেত্রে কোনও এক উপায়ে নিজেকে টেনে তুলতে হয়, তারপর চট করে দাঁড়িয়ে পড়ে একটু ধরে ধরে হাঁটার চেষ্টা করতে হয়। এতে পায়ে রক্তচলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং সেই কারণেই ফিরে আসে অনুভূতি। ঘাড়ের ব্যাথার প্রতিকার এই মুহূর্তে হবে না যদিও, ওটা সাড়তে অন্তত সপ্তাহ খানেক চলে যাবে।

এবারে শোনা গেল বাবার কণ্ঠ, “উঠবে কেন? বুড়ো গণ্ডারদের মতো ঘুমাক পড়ে পড়ে। আস্ত শুয়োর হয়েছে একটা।”

গালাগালির ব্যাপারে বাবা বেশ সচেতন। শুয়োরের বাচ্চা বললে গালিটা তার ঘাড়ে পড়বে, তাই বেশ গুছিয়ে একেবারে শাবকের নামটি বলেন।

আমি আধবসা হতে হতেই শুনলাম মায়ের প্রতিবাদী বক্তব্য, “খবরদার! বুড়ো বলবে না একদম। এমন কি আর বয়স বাবুর!”

“গণ্ডারটার বয়স পঁয়তাল্লিশ হয়নি বলছ?”

“হলে হয়েছে, তাতে তোমার কী?” পাল্টা জবাব দিল মা। “এই বয়সে কেউ বুড়ো হয় না।”

“তাহলে কত বছরে হয়?”

“আশি-পঁচাশি।”

“সে হিসাবে তো আমিও বুড়ো হইনি।” ফোঁড়ন কাটল বাবা।

ফিরতি জবাবে মাও কিছু একটা বলল বোধহয়, ঠিক শুনতে পেলাম না। এর মধ্যেই খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়েছি মেঝেতে, পা ঝিনঝিন করছে, মাথা করছে ঝিমঝিম। মোটের উপর মনে হচ্ছে ইহজগতে দাঁড়িয়ে থাকার মতো কষ্টের কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই।

এক প্রকার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আয়নার সামনে পৌঁছে দেখি ভেজা লালা শুকিয়ে ঠোঁটের নিচে একটা দিক সাদাটে হয়ে গেছে। ঘাড় বেঁকে আছে ডানে। দেখে মনে হয় গোলপোস্টের সামনে হেড করে গোল মিস হওয়ায় বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে যে চেষ্টার বিন্দুমাত্র ত্রুটি ছিল না।

ওদিকে মা-বাবার ঝগড়া তুঙ্গে উঠেছে। প্রচুর হইচই কথা কাটাকাটি, তার ভেতর থেকে ডুবুরির দক্ষতায় বক্তব্য উদ্ধারের ক্ষমতা অন্তত আমার নেই। তাই ওই চেষ্টাতেও গেলাম না।

বরং দরজা খুলে বেরিয়েই দৃপ্ত কণ্ঠে বললাম, “আহ! তোমরা থামবে?”

“ওই উঠলেন নবাবজাদা,” ধমকের কামানটা ফের আমার দিকে ঘুরিয়ে দিল বাবা।

এই গালিটার বেলায় বাবার নিয়মের ব্যাতিক্রম হয়। এটা অনেকটা নিপাতনে সিদ্ধ গালি, নিয়ম বহির্ভূত অনিয়ম। কারণ, এতে বাবার পক্ষে নবাবের খেতাব অর্জন অনায়াস।

পাল্টা প্রতিবাদী হলাম। “ছুটির দিনে এত সকালে ডাকছ কোন আক্কেলে? সপ্তাহ গেলে মোটে তো দুটো দিন ঘুমাতে পারি একটু শান্তি করে। তাও দিলে না।”

বাবা তার পালোয়ানি ভুরুটা ধনুকের মতো বাঁকা করে দৃষ্টির তীর ছুঁড়ল।

“সেকি! এর মধ্যে ভুলে গেলি?” জবাবটা প্রশ্নের আঙ্গিকে এল মায়ের পক্ষ থেকে। কোন ফাঁকে ঝগড়ার সমাপ্তি হয়ে গেছে মালুম হয়নি। বাবার চাকরি জীবনে অবসরের পর থেকেই এ জাতীয় খুচরো ঝগড়া প্রায় নিয়মিতই হয়। এগুলো যেমন ধূমকেতুর মতো আসে, তেমনি ধূমকেতুর মতোই বিদায় হয়। যাওয়া আসার আগে এরা কিছুমাত্র পূর্বাভাস দেয় না। হয়তো এ-ই নব বার্ধক্যের প্রেম! এসব দেখেই স্থির বিশ্বাস জন্মে বিয়ে না করে বিশেষ ভুল করিনি।

“ভুলবে না?” গরম তেলে জলের বিন্দু পড়লে যেমন ছ্যাঁত করে ওঠে, কথাটা ঠিক সেভাবেই বলল বাবা। “গণ্ডারের মতো বুড়ো হতে হতে স্মৃতি ঘেঁটে গেছে।”

খুব বলতে ইচ্ছা করছিল, ‘তুমিও তো কচ্ছপের মতো বুড়ো। কই, তোমার স্মৃতি তো বেশ তরতাজাই আছে। দোষটা কেবল গণ্ডারেরই কেন হবে?’ এসব বললে নিজেকে গণ্ডার মেনে নেওয়া হয়, তাই ঠোঁট খুললাম না। এদের হাড়ে হাড়ে চিনি, আমি প্রশ্ন না করলেও এক পর্যায়ে উত্তর ঠিক বেরিয়ে আসবে।

ঘরে আলাদা বেসিন না থাকায় যেতে হয় বাইরের বাথরুমে। সকালের অবশ্য কাজ দাঁত মাজা এখনো বাকি। কানের পনেরটা বাজার আগে দাঁতের যৌবন সতেজ রাখার অপচেষ্টা করতে হবে। সুতরাং, সেদিকেই পা বাড়ালাম।

কখনো কখনো দাঁত মাজার ব্যাপারটা আমার টুথপেস্ট আর টুথব্রাশ কোম্পানিগুলোর গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে হয়। ল্যাবটেস্ট করে দেখার কোন উপায় থাকলে ভাল হতো যে এগুলো ব্যাবহারের ফলে দাঁত আর জলদি ক্ষয় হয় কিনা। মাড়ির কয়েকটা দাঁত যা বুঝি এর মধ্যেই খানিকটা খাটো হয়ে গেছে। ল্যাবটেস্টের ফলাফল হাতে পেলে আসল কালপ্রিটের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যেত। এর সঙ্গে অফিসে কাজের ফাঁকে আমার ঘন ঘন চকলেট চিবনোর যে কোন সম্পর্ক নেই তাও প্রমাণ করা সম্ভব হতো।

আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই অভিযোগ তুলল মা। “একি! শেভ না করেই বেরিয়ে এলি যে!”

ভুরু তুললাম। ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে যাবার পর এ বিষয়ে মায়ের উচ্চবাচ্য বিশেষ শোনা যায়নি। আজ হঠাৎ হল কি!

“তুমি ভাল করেই জানো মা,” বললাম, “দাঁড়ি কাটলে আমাকে কলেজের ছাত্রদের মতো শিশুতোষ লাগে।”

“সেটাই তো দরকার। আর চুলে কলপ দিস, তোর বাবার গোদরেজ হেয়ারকালারের প্যাকেটটা বেসিনের উপর রাখা আছে। না পারলে বলিস, গুলিয়ে দেবো।”

কলপ! সে তো কস্মিন কালেও দিইনি! অফিসের সহকর্মীরা বরং আমার সল্ট-এন্ড-পেপার রঙা চুল দেখে ঈর্ষায় ফুঁসে মরে। ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করি। গতমাসে তো বসের পি.এ. রাজিয়া বলেই বসল, “ভাইয়া, পার্লারে গিয়ে গুচ্ছের টাকা ঢাললাম, কিন্তু আপনার এই শেডটা ঠিক পাওয়া গেল না। দেখুন না কি বাজে হয়েছে!”

আমার অবশ্য অত বাজেও লাগেনি দেখে। তবে ওর মতো যুবতিদের চুল সাদা করানোর বাতিক দেখে খানিক বিভ্রান্ত হয়েছি। আমাদের বয়সে এসে পাকা চুলটা অন্যতম সমস্যা বলেই ধরে নিতে হয়।

“আজ কী বলো তো? তোমার ভাবসাব বিশেষ সুবিধার মনে হচ্ছে না। উল্টোপাল্টা কিছু খেয়েছ নাকি?”

উপহাসে পাত্তাই দিল না মা। বরং চোখ পাকিয়ে বলল, “তুই আসলেই একটা গণ্ডার হয়ে গেছিস।”

ঝট করে চোখ তাক করলাম পেটের দিকে। ভুঁড়ি কিঞ্চিৎ হয়েছে বটে, তবে এখনো অতটা বড় হয়নি যে আমাকে গণ্ডার বলা যায়। বাবা বলে বলুক, কিন্তু মা কেন বলবে?

“বাজে কথা রেখে আসল কাহিনীটা বলো।”

“আজ গুলশানের ওই পাত্রীদের বাড়ি যাবার কথা, ভুলে গেছিস?”

চলচ্চিত্রের স্মৃতিহীন নায়কেরা যেমন মাথায় বাড়ি খেয়ে সবকিছু মনে করে ফেলে ঠিক সেভাবেই আমারও ব্যাপারটা স্মরণ হল। হ্যাঁ, গত সপ্তাহে একটা ছবি দেখিয়েছিল মা। দেখে মন্দও লাগেনি। রূপসী কন্যা, টানাটানা দুটো চোখে অপূর্ব মাদকতা মেশানো। হাসিটাও সুন্দর। বয়স বাইশ-তেইশ হবে। এখনও নাকি ইউনিভার্সিটির গণ্ডি পেরোয়নি। তবে, লেখাপড়ায় ভাল। এছাড়া নম্র-ভদ্র এবং গৃহস্থালি হিসাবে সুনাম আছে; তা অবশ্য বিবাহযোগ্যা সব পাত্রীদেরই গড়পড়তায় থাকে। কিন্তু, এমন একটা মেয়ে আমার মতো প্রায় দুগুণ বয়সী বুড়োর সঙ্গে বিয়ে করতে কেন রাজি হল তা বুঝিনি। নির্ঘাত মা বছর পনের আগের কোনো ছবি পাঠিয়েছিল ওদের। তাই দেখে মেয়েদের পরিবার বিভ্রান্ত হয়েছে। এ সমাজে ছেলে মেয়েদের নিজস্ব মতামতের গুরুত্ব মা-বাবার মতামতের তুলনায় এখনো খাটো। বিশেষ করে বিয়ের মতো ঘোড়েল বিষয়ে। অভিভাবকরা অনেক কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেয়, এবং মনে করে তাদের কষ্টার্জিত জীবন অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রয়োগ করে সন্তানদের জীবন উদ্ধার করে ফেলার কাজটি ঠিকঠাক হয়েছে। যদিও বাস্তব চিত্র সব ক্ষেত্রে এর স্বপক্ষে যুক্তি দেয় না।

“মানে? এসবের তো আমি কিছুই জানি না!” বললাম। “আমার মতামত না শুনেই আরেকজনের বাড়িতে এভাবে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলে কিভাবে?”

“তোর মতামত তো নিয়েছি।”

“কখন?”

“ঐযে সেদিন, যখন ছবিটা তোকে দেখালাম।”

“ছবি দেখে তো আমি কিছুই বলিনি!” আকাশ থেকে পড়লাম।

“মিষ্টি করে হেসেছিলি ছবি দেখে,” বলল মা।

“হাসিতে কী হয়?”

“হাসিতেই হয় রে বোকা। ওরে ছেলের মনের খবর কি আর মায়ের অজানা থাকে? ওই মেয়েকে যে তোর পছন্দ হয়েছে তা হাসি দেখেই বুঝে গেছি আমি।”

হায়রে! মা বাবারা এতো বেশি বুঝদার হয়ে গেলে তো সমাজের চোদ্দটা বেজে যাবে ক’দিন পর।

“তুমি ভুল বুঝেছ মা,” সোজাসুজি জানালাম।

“মোটেই ভুল বুঝিনি আমি,” নিশ্চিত ভাবে বলল সে। “এখন আর দেরি করিস না। আমাদের দু’ঘণ্টার মধ্যে বেরুতে হবে। সকালের খাবার করে রেখেছি, চান করে জলদি খেয়ে নিবি। এর মধ্যে তোর মামা আর মামি চলে আসবে, ওরাও সঙ্গে যাবে।”

“মা!” অভিযোগ করলাম।

ওপাশ থেকে আবার ভেসে এল বাবার হুংকার। “কী বলছে গণ্ডারটা? যেতে চাইছে না নাকি?”

তড়াক করে আগুন চড়ে গেল মাথায়। কিন্তু আমি পাল্টা কিছু বলার আগেই মা বলল, “কিছু বলছে না। তুমি যাও খাবার খেয়ে তৈরি হয়ে নাও।”

আমাকে চোখের ইশারায় চুপ থাকার অনুরোধ করে সরে পড়ল মা।

একরাশ বিরক্তি নিয়ে ঘাড় ডলতে ডলতে ঘর থেকে উদ্ধার করলাম গামছাটা। তারপর চলে গেলাম স্নানঘরে। মা যাই বলুক, কলপ আমি করছি না। একবার রঙ লাগাতে শুরু করা মানে আরও জলদি ময়দান ফকফকা হওয়া। তখন সল্ট এন্ড পেপার স্টাইল একেবারে নোনতা হয়ে যাবে, ঝাল আর থাকবে না তাতে।

স্নানের ক্ষেত্রে যে বিষয়টা আমি একেবারেই করতে পারি না তা হলো হুড়োহুড়ি। দীর্ঘ সময় নিয়ে আয়েশ করে আমাকে ব্যাপারটা উপভোগ করতে হয়। আজ বেশি দেরি হলে মা ঝঞ্ঝাট করবে, তবুও অভ্যাসবশত দীর্ঘ প্রক্রিয়াই চলল। এর আগে কখনো এভাবে মেয়ে দেখতে যাইনি। ব্যাপারটা এক প্রকার অন্যায় বলেই জানতাম, কিংবা কিশোর যুবকদের ছ্যাবলামি বলেই বিশ্বাস করতাম। বন্ধু কিংবা পরিচিতদের কেউ কেউ কলেজ জীবনে লেকের পাড়ে অথবা কোনো কোনো সুপারমার্কেটের সিঁড়িতে বসে এই চর্চা করতো। দেখতে দেখতে আওয়াজও দিত দুয়েকটা। আওয়াজদাতাকে আগত কন্যার পছন্দ হয়ে গেলে হতো ফোন নম্বর চালাচালি, তারপর তথাকথিত প্রেম। আমার দেখা মতে এসব প্রেম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবাহের পূর্ণতা পায়নি। দুয়েকটা আবার পূর্ণতা পাবার পর বিচ্ছিন্নতায় বদলে গেছে। এসব দেখে দেখে চোখ পচে গেল, তাই আর জেনেশুনে ফাঁদে পড়ার ইচ্ছা হয়নি কখনো।

ভাল করে শ্যাম্পু ঘষে চুলগুলো জড়ো করে রেখেছি মাথার পেছন দিকে। শরীরে সাবান চর্চা শুরু করতেই শুনলাম কলিংবেলের শব্দ। ওই মামা-মামি এল বোধহয়! এ ধরনের আয়োজনে তাদের উৎসাহের অন্ত নেই, নিবেদিত প্রাণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গেলবার রিকিয়ার বিয়েতে তাদের উৎসাহ ছিল দেখার মতো। রিকিয়া আমার মামির কাজিন। বিয়ে করে এখন অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী। আছে ভালই। আমিও কোনো একটা দেশে চলে যেতে পারলে মন্দ হতো না। এসব ঝঞ্ঝাট থেকে হয়তো আরও সহজেই বাঁচা যেত তাহলে।

মাথা ধুয়ে ফেলতে হ্যান্ড শাওয়ারটা সবে হাতে তুলেছি অমনি দরজায় গুম গুম আঘাতের শব্দ শোনা গেল, সঙ্গে মায়ের কণ্ঠস্বর, “বাবু, একটা প্যাকেজ ডেলিভারি হয়েছে তোর নামে। তোর ঘরে রাখতে বলেছি।”

“আচ্ছা!” আওয়াজ দিলাম।

“মামারাও চলে এসেছে, তাড়াতাড়ি কর।”

“ঠিক আছে।”

মাকে আশ্বস্ত করলেও তাড়াহুড়োয় গেলাম না। আয়েশ করে উপভোগ করলাম সময়টুকু। যতক্ষণে গামছায় মাথা ডলতে ডলতে বাইরে এসেছি, পেরিয়ে গেছে ঘণ্টাখানেক। টয়লেটের দরজার বাইরে মামার অধৈর্য পায়চারী দেখে বোঝা গেল ভাগ্নের বিলম্বে তার বিস্তর অসুবিধা হয়েছে।

“চান করতে কারো এতক্ষণ লাগে,” এই সামান্য তিরস্কারটুকু ছুঁড়ে দিয়েই জলদি ভেতরে ঢুকে দোর দিল মামা। ভেতরে সশব্দে কমোডের ডালা তোলার শব্দ পেলাম। মুচকি হেসে ঢুকে পড়লাম আমার ঘরে। মা এসে নতুন করে তাড়া দেবার আগেই লক করলাম দরজা।

মাথা মোছা শেষ হতেই চোখ দিলাম প্যাকেটের দিকে। বিরাট বড় এক বাক্স, প্রায় আলমারির সমান উচ্চতা, মজবুত প্যাকেজিং। রাখা হয়েছে আমার স্টাডি টেবিলের পাশে। ডেলিভারি ম্যানরা নিশ্চয়ই ভেতরে এসে রেখে গেছে, ওদের জুতোর ছাপ পড়ে আছে টেবিলের ধার ঘেঁষে। আগামীকাল বেলা বারোটার আগে এই ছাপ পরিষ্কার হবে না। তাও যদি দয়া করে বুয়া কাল কাজ করতে আসার দায় দেখায়! মাসে পাঁচ সাত দিন নানান কারণে তার কর্মস্থল থেকে দূরে থাকতে হয়। ফিরে এসেই মা’র কাছে চলে রাজ্যের অজুহাতের ফিরিস্তি। দীর্ঘদিনের পরিচয় বলে মা এখনো ছাড়াতে পারে না। কেবল না এলে বিরক্তিতে সারাদিন গজগজ করতে থাকে বাড়ির বাকিদের সঙ্গে।

জুতোর ছাপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে এলাম বাক্সের উপর। জিনিসটা একেবারে সময় মতো চলে এসেছে। জলদি মোড়ক উন্মোচন করে ফেলতে হবে।


দরজায় মায়ের কিল পড়তেই হুঁশ ফিরল খানিকটা। এতক্ষণ তন্ময় হয়ে লেগেছিলাম কাজে। স্নান করে লাভ হয়নি বিশেষ। গেল এক ঘণ্টার পরিশ্রমে ঘেমে নেয়ে গেছি। ভিজে সপসপে গেঞ্জিটা সেঁটে গেছে একেবারে গায়ের সঙ্গে। নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। ফ্যানের বাতাসে বিশেষ উপকার হয়নি।

“বাবু, বাবু!” মায়ের কণ্ঠে ক্রোধ। “জলদি বের হ বলছি।”

ও পাশ থেকে নাকি সুরে ফোঁড়ন কাটল মামা, “বাবারে! আমার ভাগ্নেটা বিয়ে শাদিতে এতো ভয় পায়! কাপুরুষ কোথাকার। তোর মামাকে দেখ ছাগল, বীরের মতো পঁচিশ বছর বয়সেই কাজের কাজটা করে ফেলেছে।”

বাবা আমাকে গণ্ডার বলে প্রায় ডেকেই ফেলেছিল, আমি হলপ করে বলতে পারি অন্তত ‘গণ্ডা’টুকু আমার কান অব্দি পৌঁছেছিল। তবে বোধকরি মাঝ পথে মামার বড়াই শুনে ব্রেক কষে তিরস্কারটা তার দিকে আঘাত হানল, “কেবল বিয়েই করেছ গণ্ডারের মতো, কচিকাঁচা আর দেখাতে পারলে না এতদিনে।”

মামা চুপসে গিয়ে বলল, “প্রতিদিন এক কথা বলে যে কি শান্তি পান আপনি! আপনার ক্লান্ত লাগে না?”

“না। লাগে না। জাগতিক সব গণ্ডারকে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিরস্কার করার এনার্জি রাখি।”

মা বাঁধা দিল, “আহ থামো তো! ওদিকে তোমার গণ্ডার তো এখনো ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ভয়ে আবার অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে যায়নি তো?”

“দরজা ভেঙ্গে দেখব, আপা?” অগ্রসর হলো মামা।

অবস্থা বেগতিক দেখে আমি সাড়া দিলাম, “আসছি।”

“দুই মিনিটের মধ্যে বাইরে না এলে দরজা ভেঙ্গে ফেলব,” উৎসাহী হয়ে বলল মামা। “এরকম একটা পবিত্র কাজে ভয়ে পেয়ে দরজা আটকে রাখা? ছিঃ ছিঃ ছিঃ! পাড়ায় আর মুখ দেখানোর উপায় রইল না।”

“তুমি এ পাড়ায় থাকো না,” বাবা মনে করিয়ে দিল। “সুতরাং, গণ্ডারের মতো কেবল বাজে বকবে না। যাও ওদিকে গিয়ে বসে থাকো। নাহলে দরজা সারানোর খরচটা তোমার থেকে উশুল করা হবে।”

কথা আরও বাড়ার আগে চটজলদি ভেজা গামছাটা দিয়ে আরেকবার নাক-মুখ মুছে নিলাম। ভেজা গেঞ্জি দিয়েই শরীরটা মুছে একটা পাঞ্জাবি উদ্ধার করলাম আলমারি থেকে, সঙ্গে রইল পায়জামা। চুল আঁচড়ে নিতেই মোটামুটি একটা সেমি-জামাই ভাব চলে এল মুখমণ্ডলে। ভুঁড়িটা অবশ্য রসিকতা করে একটু বেশিই ফোঁস ফোঁস করছে পোশাকের নিচে। সেটাকে পাত্তা দিলাম না। অপরিষ্কার ঘরদোর দেখে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাঁধ ঝাঁকালাম। সবকিছু মিটে গেলেও এ নিয়ে মা প্রচুর চেঁচামেচি করবে। সে দেখা যাবে পরে।

সৃষ্টিকর্তার স্মরণ নিয়ে তিনবার দোয়া পড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম বাইরে।

আমাকে দেখেই বাবার রাগ ধপ করে পড়ে গেল অনেকটা।

মা হাসিমুখে বলল, “বাহ, এইতো একেবারে রাজপুত্রের মতো লাগছে।”

মামি মিটিমিটি হেসে বলল, “আমাদের বাবুর এতদিনে তাহলে মতি হল?”

মামা দূরের সোফা থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে না পেরে দাঁড়িয়ে গেল। দেখি তার মুখেও হাসি।

মনে মনে একবার ঢোঁক গিলে আমি ডাকলাম, “কি হল! এখনও ভেতরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? বাইরে এসো। গুরুজনদের আশীর্বাদ নাও।”

কথাটা শুনেই বাবা তুলে নিল ভুরুর তীর ধনুক। চোখ কুঁচকে এল মা ও মামার। মামি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইল আমার ঘর থেকে বেরিয়ে আসা ঘোমটা টানা এক নারীমূর্তির দিকে।

“ও…ওটা কে বাবু?” প্রথমে কথা খরচে সাফল্য পেল মা।

বাবার চোখ তখন কেরোসিন মাখা দৃষ্টিবানে অগ্নিসংযোগ করে ফেলেছে।

মামা কিংবা মামি কিছু বলার আগেই আমি জবাব দিলাম, “এই হল তোমাদের বৌমা, আমার অর্ধাঙ্গিনী, সুইটি।”

সুইটি ততক্ষণে হুকুম তামিল করা শুরু করে দিয়েছে। বাবা লাফিয়ে সরে যাবার আগেই তার পা ছুঁয়ে ফেলেছে। এরপর মায়ের পা ছুঁয়ে চলে গেছে মামির কাছে। মামিও এড়াতে পারেনি আক্রমণ। এরপর মামার পাথর হয়ে যাওয়া মূর্তিকে খুঁজে পদ স্পর্শ করতেও খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি তাকে। পুরো দায়িত্ব শেষে ভদ্র গৃহিণীর মতো এসে দাঁড়িয়ে গেছে আমার পাশে।

“তু…তুই এটা কী করলি বাবু?” তোতলাতে তোতলাতে বলল মা। “কবে করলি?”

“এইতো একটু আগেই।”

“গণ্ডারের মতো মশকরা করো না।” রাগে তেঁতে উঠল বাবা। “এই মেয়ে এল কোত্থেকে? কখন ঢুকিয়েছ তোমার ঘরে?”

“বা-রে এই যে কিছুক্ষণ আগেই ডেলিভারি দিয়ে গেল সোজা আমার ঘরে।”

মায়ের কণ্ঠে প্রকাশ পেল সন্দেহের সুর, “দিয়ে গেল মানে? ওই বাক্সে?”

“একদম ঠিক।”

“আজকাল বৌ ডেলিভারি সার্ভিস চালু হয়েছে নাকি?” চোখ কপালে তুলল মামা। “ঈশ, আগে জানলে তো আমিও…”

মামির চোখ কটমটানি দেখে মাঝপথেই থেমে গেল সে।

“বৌ ডেলিভারি নয় মামা, রোবট ডেলিভারি,” বুঝিয়ে দিলাম সহজে। “তবে আনপ্যাক করার সঙ্গে সঙ্গেই ওকে সেটআপ করে আমি বিয়ের চুক্তি সাক্ষর করে নিয়েছি। ও এখন আমার বিবাহিত স্ত্রী, সুইটি। তোমাদের সবার আদরের গৃহবধূ।”

কথা শুনে বাবার টানটান ভুরুর ধনুক নেমে এল নিচে। “ওহ! রোবট!” এক কথায় হাঁপ ছাড়ল বাবা, “রোবট কখনো স্ত্রী হতে পারে না। তুমি তাড়াতাড়ি জুতো পরে নাও, ওদিকে পাত্রীরা অপেক্ষায় আছে।”

“তোমার একটু ভুল হল বাবা,” শান্ত ভাবে বললাম। “গত বছরেই পার্লামেন্টে আইন পাশ হয়েছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ চাইলেই এখন আধুনিক জীবনসঙ্গী শ্রেণীর রোবটকে বিয়ে করতে পারে। রোবট কার্যকর করার পর বিয়ে সংক্রান্ত অপশন চালু করে পরস্পরকে ১৮৭৭ বললেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। শব্দ তরঙ্গ আর চোখের স্ক্যান ডাটার মাধ্যমে রোবটটি তার জীবনসঙ্গীকে রেজিস্টার করে, আর বিয়ের চুক্তিটি সরাসরি চলে যায় সরকারি বিবাহ নিবন্ধন অধিদপ্তরে। এক সপ্তাহের মধ্যে ডাকযোগে বিবাহের দলিল পৌঁছে যায় বিবাহিতদের ঠিকানায়। কয়েকদিন অপেক্ষা করলেই দেখতে পাবে।”

মা হঠাৎ ভরশূন্য হয়ে বসে পড়ল মেঝেতে। হাহাকার করে বলল, “এটা তুই কি করলি বাবু? মা-বাবার উপর এতো বড় একটা প্রতিশোধ নিলি।”

“এতে প্রতিশোধের কী দেখলে মা?” হেসে বললাম। “স্ত্রী হিসাবে সুইটি আর দশটা নারীর থেকে অনেক ভাল। দেখবে তোমার সঙ্গে ওইসব বস্তাপচা সিরিয়ালের বৌদের মতো ঝগড়া করবে না। বাড়ির সব কাজে হাসিমুখে তোমার সাহায্য করবে। আমারও সেবা যত্ন করবে। এক কথায় বলতে পারো, একজন আদর্শ স্ত্রীর সব সুবিধা ওর সামর্থ্যের মধ্যে আছে, কেবল অসুবিধাগুলো নেই। ঝগড়াঝাঁটি আর অভিমানবিহীন একটা নিশ্চিন্ত জীবন, যেমনটা তোমরা কল্পনাও করতে পারো না। একজন মানুষের জীবনে আর কী চাই?”

বাবা কিছুটা নরম হয়ে বলল, “কিছু ঝগড়ারও প্রয়োজন আছে বাবু। ও ছাড়া জীবন পানসে হয়ে যায়।”

“তেমন প্রয়োজন বোধ করলে ঝগড়াও করতে পারবে সুইটি। আমার মনে সে ধরনের আকাঙ্ক্ষা খেয়াল করলে ও নিজের যুক্তিতে সামান্য পরিবর্তন করে সেটা করতে পারবে। তবে খুব বাড়াবাড়ি হবে না কখনই, আর রেগেমেগে আমাকে ছেড়ে চলেও যাবে না।”

“তুমি তাহলে সিদ্ধান্ত বদলাবে না?” শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করল বাবা।

“উঁহু।”

সুইটি বলল, “বাবা আপনি বসুন, আপনার জন্য এক গ্লাস শরবত বানিয়ে আনছি। দেখবেন ভাল লাগবে।”

বাবা হতাশ হয়ে তাকিয়ে রইল সুইটির দিকে। কেউ বলে না দিলে সে যে রক্ত মাংসের মানুষ নয় তা বোঝা অসম্ভব। আর দশটা নারীর মতো তার আকৃতি প্রকৃতি একেবারে স্বাভাবিক। এমনকি স্পর্শ আর অনুভূতিতেও একেবারেই মানবিক।

অবশেষে আমি গিয়ে টেবিলে বসলাম। এখনও পেটে কিছু পড়েনি এসব গোলমালে। বড্ড খিদে পেয়েছে। মুরগির মাংস প্লেটে নিয়ে পরোটা ছিঁড়ে খেতে খেতে আব্দার করলাম, “আমার জন্যও এক গ্লাস ঠাণ্ডা শরবত এনো তো।”

“আচ্ছা আনছি,” কিচেনে চামচ নাড়তে নাড়তে বলল সুইটি।

মা তখনও বিড়বিড় করে চলেছে, “এখন মেয়েদের বাড়িতে কী জবাব দেবো? ওরা কী ভাববে?”

হঠাৎ টেলিফোনের আওয়াজে ছন্দ পতন হল তার। বাবার মোবাইল বেজে উঠেছে, কাঁপা হাতে ফোনটা তুলল বাবা, আগামি কয়েকটা মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত করল নিজেকে। এই মুহূর্তে তাকে কচ্ছপের মতো ধীরগতির মনে হচ্ছে। বুঝলাম কন্যা পক্ষ থেকেই এসেছে ফোনটা। বাবা দুর্বল ভাবে বলল, “হ্যালো।”

“হ্যালো, কাজল সাহেব বলছেন?” ওপাশ থেকে শোনা গেল পাত্রীর বাবার কণ্ঠস্বর। বাবা লাউড স্পিকারটা চালু করে দিয়েছে। এতো বড় একটা খবরের বোঝা বোধকরি একা ঠেলতে ভয় পাচ্ছে।

ঘরে পিনপতন নীরবতা, কেবল সুইটির চামচ নেড়ে জলে চিনি মেশানোর শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমি চোখের ইশারায় তাকে থামতে বললে সে থেমে গেল আমার পরবর্তী অনুমতির অপেক্ষায়।

“বলছি,” শুষ্ক কণ্ঠে জবাব দিল বাবা।

“আপনাকে কথাটা যে কিভাবে বলি,” ওপাশ থেকে শুরু করলেন ভদ্রলোক।

“বলুন, শুনছি,” এর বেশি কিছু বলা সম্ভব হল না বাবার পক্ষে।

“আসলে কাল রাতেই আমার মেয়ে একটা জীবনসঙ্গী শ্রেণীর রোবটকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে এসেছে। সারারাত ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কোন কাজ হয়নি। উজবুকটা ওই রোবটের সঙ্গেই নাকি সংসার করবে! আমি ভীষণ লজ্জিত। এমন একটা পরিস্তিতি, এর মধ্যে আপনাদের আসাটা বোধহয় ঠিক হবে না।”

অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে বাবা একবার ফোনটাকে দেখল তারপর চোখ রাখল আমার দিকে। মায়ের মুখও হা হয়ে গেছে।

ওপাশ থেকে ভেসে এল কণ্ঠস্বর, “কাজল সাহেব, আপনি শুনছেন? আপনারা আবার বেরিয়ে পড়েননি তো? কাজল সাহেব? হ্যালো… হ্যালো…”

© P G Dastider. All rights reserved. Work ID: 824d1f803af3e7ce