অধ্যায় ১


সূর্যটা মাথার উপর দাউ দাউ করে জ্বলছে। প্রকৃতির উপহাস পৃথিবীর মানুষের জন্য। আলো না হলে চলে না, আবার উত্তাপও অসহ্য লাগে। কানের পেছন দিয়ে ঘামের রেখা নেমেছে ফয়সালের, কপাল ভিজে গেছে নোনা জলে। পরনের হাফ-হাতা গোল গলার গেঞ্জিটা ভিজে চুপচুপে। স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে লুঙ্গিও, কোমরের ধার ঘেঁষে। তবুও অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে ও, লক্ষ্য একটা অচেনা গাছ।

ফয়সাল যুবক, বয়স একুশ-বাইশের কাছাকাছি। পেশায় কৃষক। কৃষিজীবী পেশা পারিবারিক সূত্রেই পাওয়া। ফয়সালের বাবা কামরান হাদুরিও এই পেশায় যোগ দিয়েছিল বাবার হাত ধরে। ছোট্ট সংসার গড়ে তুলতে তুলতে কখন যে মৃত্যুর মুখে পৌঁছে গেছে টেরও পায়নি বেচারা। তিন ছেলে আর এক মেয়েকে রেখেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে কামরান। পরিবারের ছোট ছেলে ফয়সাল। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে পাশের গ্রামে। হাদুরি পরিবারের বর্তমান জ্যেষ্ঠ সন্তান রিপন পারিবারিক পেশা ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছে শহরে। সেখানে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে আপাতত একটা পোশাক কোম্পানিতে ম্যানেজারের কাজ পেয়েছে। বিয়ে করেছে, সুখেই আছে। মেজো ভাই জামাল আর ফয়সাল দুজনে মিলে সামলায় কৃষিকাজ।

“এটা কী গাছ?” জামালকে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল ফয়সাল।

সীমান্তপুর গ্রামের একেবারে সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে ওরা। এই গ্রামের মাঝামাঝি ওদের বিশাল ক্ষেত, তার কিছু দূরেই বাড়ি। এপারের সীমানা পেরুলেই মায়াপুর গ্রাম, সেখানেই বোন আসিয়ার বিয়ে দিয়েছে। কুটুম বাড়িতে কাল রাতটা কাটিয়েছে দুই ভাই। সকালেও নাশতা না করিয়ে ছাড়তে চায়নি আসিয়া। ভালোই পটের বিবিটি সেজে বসেছে ওই বাড়িতে। বাড়ির বড় পুত্রবধূ বলে কথা। তাছাড়া কুটুমদের অবস্থা বেশ স্বচ্ছল, ওঁদের মধ্যে এক ধরণের সহজাত আধুনিকতা আছে। গ্রাম্য ভাবটা অবশ্য সীমান্তপুরেও বিশেষ নেই, ছোট ছোট স্কুল আর টিভি-টেলিফোন ইত্যাদি মিডিয়ার কল্যানে তা প্রায় উঠেই গেছে আজকাল। তবে মানুষগুলো আজও বড় সাদাসিধা। খুব একটা জটিলতা নেই ওঁদের মাঝে।

কুটুম বাড়ির সকলেই আসিয়ার হুকুম মানে। শ্বশুর শাশুড়ি না থাকায় এক প্রকার উপকার হয়েছে মেয়েটার। শতভাগ ক্ষমতা ওর হাতেই, স্বামীও বাঁধা দেয় না। তাই ও এক প্রকার জোর করেই খাইয়ে দিয়েছে দুই ভাইকে। তারপর এটা সেটা করতে করতে বেলা বেড়ে গেছে অনেকটাই। গ্রামের পথে রিকশা চলে না, দুই ভাই পায়ে হেঁটেই চলেছিল বাড়িতে। হাঁটা পথ ওঁদের গায়ে লাগে না, মাঠে কাজ করে করে পরিশ্রমের অভ্যাস হয়ে গেছে। মাত্র তিন ঘণ্টার পথ, এ আর এমনকী!

দুজনে বেশ গল্প করতে করতে চলছিল কিন্তু সীমান্তপুরের সীমানা ঘেঁষা মাতাহুরু পাহাড়ের কোলে গাছটা দেখেই থমকে গেছে ওরা। বিচিত্র গাছ। কাণ্ড-গুড়ি থেকে শুরু করে ডালপালা পর্যন্ত বেগুনি রঙয়ের, পাতাগুলো কমলা। গাছে ফলের বালাই নেই, ফুলও নেই। দক্ষিণা হাওয়া পাতাগুলো ফরফর করে নড়ছে।

ভাইয়ের প্রশ্নের জবাব দিল জামাল, “জানি না রে। আগে কখনও দেখিনি।”

সীমান্তপুর, মায়াপুরে শুদ্ধ ভাষা চলে, স্কুল শিক্ষার জন্যই কেবল নয়, এজন্য এলাকার মানুষের সচেতনতাও এক অর্থে কাজে লেগেছে। নিজেদের মধ্যে কথোপকথনে যেটুকু আঞ্চলিকতার ছাপ ছিল তা আরও তিন প্রজন্ম আগেই ধুয়ে মুছে গেছে। এই এলাকার প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। এছাড়াও হস্তশিল্পের মাধ্যমে অনেকেই উপার্জন করে। মাটির বাসন-পুতুল, কিংবা পাটের ব্যাগ, টুপি, ইত্যাদি গড়ে।

“গাছটা কি সুন্দর, তাই না?”

জামাল বিরক্ত হলো, “এই গাছ তোর সুন্দর লাগছে?”

“চমৎকার পাতা, দারুণ রঙ গাছের।”

“চমৎকার না হাতি!”

“বলিস কি তোর ভাল লাগছে না?”

“একদম না,” ঘোষণা দিল জামাল।

ফয়সাল নাছোড়বান্দার মতো বলল, “কী ভালো লাগছে না?”

“কোনও কিছুই ভালো লাগছে না। দেখে মনে হচ্ছে এটা শয়তানের গাছ।”

“যাহ্‌! কি যে বলিস!” বিরক্তিতে ঠোঁট বাঁকাল ফয়সাল। “গাছ মানুষের জীবন বাঁচায়, মানুষকে খাবার দেয়। গাছের সঙ্গে শয়তানের কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না।”

“জানি না বাবা! যা মনে হচ্ছে তাই বললাম।”

জামাল ফয়সালের থেকে মাত্র এক বছরের বড়। ওঁদের মধ্যে মধুর সম্পর্ক, ঠিক যেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাঝে থাকে।

ছোট ভাইকে তাড়া দিল জামাল, “চল ভাই, বেলা হয়ে গেল, মা চিন্তা করছে।”

“নাহ, ফোন করে দিয়েছি বের হবার সময়। চিন্তা করবে না।”

“সেজন্যই বেশি চিন্তা করবে, ফোন করেছি অথচ বাড়ি ফিরছি না, চিন্তার বিষয় তো বটেই।”

ঘড়ির দিকে চোখ রাখল ফয়সাল। আড়াই ঘণ্টা পেরিয়েছে ওরা কুটুম বাড়ি ছাড়ার পর। চোখ কপালে উঠল ওর। “একী! এতক্ষণ হল কী করে?”

“হবে না? আমরা মূর্খে মতো হা করে তখন থেকে গাছটার দিকে তাকিয়ে আছি। তা প্রায় চল্লিশ মিনিট তো হবেই!”

“দাঁড়া ওটা একটু ছুঁয়ে দেখি।”

“না, ছুঁতে হবে না,” জামাল তড়িঘড়ি করল।

“ছুঁলে কি হবে?”

“তুই কি এখন গাছের সঙ্গে বসে প্রেম করবি যে ছুঁতে হবে?” পাল্টা প্রশ্ন করল জামাল।

প্রেমের কথায় সামান্য লজ্জা পেল ফয়সাল। প্রেম তার আছে, পাশের বাড়ির লিলির সঙ্গে। প্রতি সন্ধেয় তারা নদীর ধারে দেখা করে। সেখানে লিলির কোলে মাথা রেখে পেরিয়ে যায় এক-দেড় ঘণ্টা। ব্যাপারটা ভাবতেই শিউড়ে উঠল ও। কুটুম বাড়িতে যাবার খবরটা লিলিকে জানানো হয়নি, মেয়েটা গতকাল নদীর পাড়ে ওকে না পেয়ে নিশ্চয়ই ক্ষেপে ব্যোম হয়ে আছে! আজ কতদূর হয় কে জানে! এত ঝগড়ুটে মেয়ে খুব কমই আছে এ-তল্লাটে। তবুও কি করে যেন ওরই প্রেমে পড়ে গেছে ফয়সাল। প্রেম বিষয়টা ভারী অদ্ভুত, হুট করে হয়ে যায়, যুক্তি বুদ্ধির ধার ধারে না।

লিলির কথা মনে পড়তেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল ফয়সাল। “চল, চল, বাড়ি চল।” ভাইকে তাড়া দিল সে।

“কেন, আরেকটু থাকি,” মজা করে বলল জামাল।

“না, থাকতে হবে না। চল।”

“আমি থাকতে চাই।”

“তা হলে তুই থাক, আমি চললাম,” বলেই বাড়ির পথে হাঁটা দিল ফয়সাল। পাথুরে রাস্তা ধরে হাসতে হাসতে ভাইয়ের পিছু নিল জামাল। পাহাড় থেকেই জঙ্গলের শুরু, খুব ঘন নয়, কিন্তু জঙ্গল বলে কথা। দিনে দিনে পেরুতে না পারলে ওতে ওঁৎ পেতে থাকা বিপদ সামনে এসে পড়ে। সাপখোপে ভয় পায় না দুই ভাই, কিন্তু মাঝে মধ্যে ডাঁশবাঘ আর বুনো কুকুরের পাল্লায় পড়ে গেলে বড্ড বিপদ হয়। জঙ্গল শিকারিদের আশ্রয়স্থল এখানে বেঁচে থাকতে হলে শিকারি হতে হয়। জামাল-ফয়সাল শিকারি না হলেও হাতের তালুর মতো জঙ্গলটা চেনে। প্রয়োজনে পিটিয়ে দুই একটা ডাঁশবাঘও মেরে ফেলতে পারে। জঙ্গল নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই ওদের।

সূর্যটা একটু একটু করে সরছে। সেই সঙ্গে সরছে অচিন বৃক্ষের ছায়া। ছায়াটা বন থেকে দূরেই হারিয়ে যাবে, এই পর্যন্ত পৌঁছবে না। কিন্তু ফয়সালরা আর একটু অপেক্ষা করলেই দেখতে পেত ছায়ার নিচে ঢাকা পড়া কিছু গুল্মলতার অন্তিম পরিণতি। ছায়ার স্পর্শে খুব দ্রুতই ত্বক থেকে জলকণা হারিয়ে নির্জীব হয়ে পড়ল সেগুলো। তারপর একেবারে শুষ্ক ধুলোর মতো হয়ে গেল কিছুক্ষণ পর। দমকা হাওয়ার তোড়ে পরক্ষনেই উড়ে বাতাসে মিশে গেল বহুকাল ধরে বেড়ে ওঠা সেইসব লতাপাতা। আর কোনও অস্তিত্বই রইল না।

© P G Dastider. All rights reserved. Work ID: db5d8e932e8eedba