অধ্যায় ৩


“কাল আসোনি কেন?”

অভিমানে লাল হয়েছে লিলির মুখটা। ফর্সা বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয় ও, কিন্তু রেগে গেলে শ্যামলা চেহারায় ঠিক ফর্সা মেয়েদের মতো লাল হয়ে যায়।

ফয়সাল পরিস্থিতি মেপে ধীরে সুস্থে বলল, “কুটুম বাড়ি গিয়েছিলাম।”

“কুটুম?” ভুরু তুলল লিলি।

“ওই তো, মায়াপুর গাঁয়ে, আসিয়ার শ্বশুর বাড়ি গো,” খানিকটা আদুরে কণ্ঠে বলল ফয়সাল।

আদুরে ভাবটা গায়েই মাখল না লিলি। “ওহ, ওই কুটুম!” ঠোঁট উল্টালো সে।

বয়সে আসিয়ার থেকে চার বছরের ছোট লিলি। উচ্চতায় প্রায় সমান। আসিয়ার বিয়ে হয়েছে দু’বছর। এর আগে ফয়সালের সব কাজ কর্মের উপর জোর করে নজর রাখত দিদি আসিয়া। লিলিকে ওর ধারে কাছে ঘেঁষতে দিত না। তাই ওর সঙ্গে লিলির দা-কুমড়োর সম্পর্ক। একজনকে দেখলেই অন্যজন মুখ ঘুরিয়ে নেয়, নাম শুনলেই ক্ষেপে যায়।

আসিয়ার বাড়িতে যাবার কথা শুনে স্বভাবতই খুশি হতে পারে না লিলি। বলে, “বড় আমার কুটুম। ওখানে না গেলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?”

“জামাল গেল, আমি না গেলে খারাপ দেখাত,” মিনমিন করে বলল ফয়সাল। “তাছাড়া, আসিয়াও খুব করে যেতে বলেছিল। মাও জোরাজুরি করল। তাই-”

“তাই তুমিও চললে নাচতে নাচতে।” কথাটা মাটিতে পড়তে দিল না লিলি। “তোমাকে চিনি না আবার! খাবারের গন্ধ পেলেই দে ছুট।”

“মোটেই না।”

“অবশ্যই।”

“কর্তব্য বলেও তো একটা কথা থাকে লিলি।”

“সব বাজে কথা।” লিলি মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আলতো করে ওর চুলে হাত রাখল ফয়সাল। রেশমের মতো মোলায়েম ওর ঘন কালো কেশ। তাতে মিষ্টি ঘ্রাণ মাখা। তেলের ঘ্রাণ? ভাবনায় ইতি টানল ও। যা খুশি হোক!

সীমান্তপুরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা মাহুরু নদীর পাড়ে বসে আছে ওরা। এ ধারটায় জেলে নৌকার আনাগোনা নেই, কারণ মাছের এই অংশে অভাব রয়েছে। নদীটা বাঁক নিয়েছে গ্রামের পশ্চিম ধার ধরে। ওখানটায় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়, তাই জেলেরা ওখানেই ভিড় করে থাকে। নদী পারাপারের জন্য ঘাটও তৈরি হয়েছে ওখানে। রোজ সকালে দূর দূরান্ত গ্রাম থেকে এ গাঁয়ে মানুষ আসে সস্তা দরে মাছ কিনতে। পাইকারি বাজার বসে ভোর ছ’টায়। আটটার মধ্যে সব মাছ বিকিয়ে যায়। গ্রামে ঢোকার অন্য আর একটাই পথ আছে, সেটা মায়াপুর হয়ে জঙ্গল পেরিয়ে। স্থানীয়রা ছাড়া সাধারণত ওদিক দিয়ে কেউ যাতায়াত করে না।

লিলি নদীর তরঙ্গের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছাড়ো আমাকে।”

“যদি না ছাড়ি?”

“ধাক্কা মেরে তোমাকে জলে ফেলে দেব।”

“ঈশ!”

“দেখতে চাও?”

“না বাবা,” আঁতকে ওঠে ফয়সাল। “যা গুন্ডা মেয়ে তুমি, ফেলেও দিতে পারো।”

ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল লিলি, “কি আমি গুন্ডা! এত বড় কথা?”

“উঁহু, ভুল বললাম। গুণ্ডি।”

“তবে রে-”

জোরে ফয়সালকে ধাক্কা মারল লিলি। ডিগবাজি দিয়ে সামলে নিল ফয়সাল। নদী তীরে ঘাসের বালাই নেই, আছে বিস্তীর্ণ এঁটেল মাটি। পিছল মাটিতে সামলে নেয় ও। ক্ষেতে দীর্ঘদিন কাজ করে এই মাটিতে ভারসাম্য না হারাবার অভ্যাসটা করে নিয়েছে সে।

“এতো রাগ করছ কেন?” দূরে বসেই বলল ফয়সাল।

লিলি তখনও ফুঁসছে। “না, রাগবে না। আমা গুণ্ডি বললে আমি রাগবই।”

“বা-রে সবাই যখন বলে তখন তো রাগ না!”

“সবাই আর তুমি এক হলে?”

“আমি বিশেষ কেউ নাকি?”

“হুম।” এবারে একটু নরম হল মেয়েটা। ফোঁসফোঁসানি ভাবটা কমতে দেখে এগিয়ে এল ফয়সাল।

“কে আমি?”

“তুমি একটা হাঁদারাম।”

“ধ্যাৎ!”

লিলি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। নদীর ওধার দিয়ে ভেসে আসছে মোটর চালিত নৌকার ভটভট আওয়াজ। বাতাসে ভর করে বহুদূর ছড়িয়ে যায় সেই শব্দ। ফয়সাল মাথা রাখল লিলির কোলে। মেয়েটার রাগ কমে গেছে, এখন ঘনিষ্ঠ হতে দোষ নেই। লিলি একটু মাথাগরম মেয়ে, কিন্তু ওর রাগ যত দ্রুত ওঠে ঠিক ততই দ্রুত চলেও যায়। দীর্ঘদিন মেলামেশায় পরস্পরের অভ্যাসগুলোকে বেশ জেনে নিয়েছে দু’জন।

“জানো লিলি-”

“না বললে জানব কী করে?”

“আরে বাবা বলছি তো। শোনই না।”

“শুনছি।”

“মধুপুর থেকে ফেরার পথে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম।”

“কি জিনিস?”

“একটা গাছ।”

ঠোঁট বাঁকাল লিলি। “গাছ! ধ্যাৎ। আমি ভাবলাম আশ্চর্য কিছু দেখেছ। এমন ভাবে বললে!”

“আশ্চর্যই বটে। বেগুনি গাছ, তাতে কমলা পাতা। গাছটার ভেতর কেমন যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে।”

“বেগুনি গাছ! কমলা পাতা! ঠিক দেখেছ?”

“তবে আর বলছি কি!”

“ঠিক কোথায় বল তো?”

“ওইতো, মাতাহুরু পর্বতের ঢালঘেঁষে একটা সরু পথ আছে না? ওই পথের বাঁকেই। পাহাড়ের একটু উপর দিকেই গাছটা।”

“কিন্তু ওখানে তো অমন কোনও গাছ ছিল না,” বলল লিলি। “ওই পথ দিয়ে বেশ কয়েকবার যাতায়াত করেছি, কখনও চোখে পড়েনি।”

মেয়েটার কথা শুনে খানিক চিন্তিত হয়ে পড়ল ফয়সাল। বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখেনি আগে। সত্যিই তো! ওরা মায়াপুরে যাবার সময়েও ওই পথ দিয়েই হেঁটেছিল, তখন তো দেখেনি। তা হলে হুট করে গাছটা এল কোথা থেকে! গাছ তো আর রাতারাতি আকাশ থেকে হাজির হতে পারে না!

ওকে চুপ থাকতে দেখে তাড়া দিল লিলি, “কী ভাবছ অত?”

“কই, কিছু না তো।” সামলে নিতে চাইল ফয়সাল।

“গাছটা সত্যিই দেখেছ? নাকি মজা করছ?”

“সত্যি বলছি, তোমার কসম।”

“বাংলা সিনেমার মতো কথায় কথায় কসম দেবে না।”

“আচ্ছা যাও, দিলাম না। কিন্তু, ওটা সত্যিই দেখেছি। জামালকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝবে আমি ঠিক না ভুল।”

“না থাক। ওকে জিজ্ঞেস করে কাজ নেই,” জামালের প্রসঙ্গে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না লিলি, ফয়সালের সঙ্গে জড়িয়ে যাবার আগে জামাল ওর চতুর্দিকে ঘুরঘুর করতো। পরে ভাইয়ের প্রেয়সী হওয়াতে এখন দূরত্ব রেখে চলে। দূরত্ব লিলিও রাখে। বিয়ের পর যখন সম্পর্কের জটিলটাগুলো ঘুচে যাবে তখন আর কোনও সমস্যা থাকবে না, তেমনটাই আশা ওর।

“বিশ্বাস করো,” ফয়সাল জোর দিয়ে বলল।

“করলাম। কিন্তু গাছটা একবার দেখাতে হবে।”

“আচ্ছা, দেখাব।”

“এখন যাবে?”

“না না,” ঝট করে কোল থেকে মাথা তুলল ও। “রাতে দেখলে বুঝবে না হয়তো। কাল সকালেও সম্ভব না, ক্ষেতে বীজ ছাড়তে হবে। জামাল একা সামলাতে পারবে না। আমিও হাত লাগাব। আচ্ছা এক কাজ করো, পরশুদিন চলো। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব, দুপুরের আগেই ফিরব। পারবে যেতে?”

চোখ বন্ধ করে খানিকটা ভেবে নিল লিলি। সকালে উঠে ওর বাবা যায় মাছের বাজারে। মাছ কিনে শহরের আড়তে পাঠায়। এটা ভদ্রলোকের প্রধান ব্যবসা। শহরে চড়া দামে বিক্রি হয় মাছ। তবে সেসব দেখতে যায় না আমানত শেখ। সে নদীর ওপারে মাছ পৌঁছে দেয় ট্রলারে করে, মোটামুটি একটা লাভে সেখানেই মাছগুলো দিয়ে আবার ট্রলারে ফিরে আসে। ওপাড় থেকে শহরের ট্রাক মাছগুলো বরফ চাপা দিয়ে নিয়ে চলে গন্তব্যে। এসব কাজ সারতে সারতে বারোটা বেজে যায় লিলির বাবার।

“আটটায় চলো,” হিসেব করে বলল লিলি। “কিন্তু, বারোটার আগে আগে ফিরতে হবে।”

“আচ্ছা।”

উঠে দাঁড়াল ফয়সাল। লিলিও উঠে দাঁড়াল। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। ফয়সালের সমস্যা না থাকলেও লিলির আছে, দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে। নইলে বাবা খুঁজতে বেরুবে। ধরা পড়ে গেলেই বিপত্তি। যুবতী মেয়ের প্রকাশ্য প্রেম আজও মা-বাবারা খুব একটা ভাল চোখে দেখে না।

© P G Dastider. All rights reserved. Work ID: 67cc819f850785be