অধ্যায় ২
স্কুল শিক্ষক আজাহার হোসেন সবে ক্লাস শেষ করে বেরিয়েছেন। চতুর্থ ঘণ্টা সমাপ্ত, এখন টিফিন পিরিয়ড। বাচ্চাগুলো সব হই-হই করে বেরিয়ে আসছে সামনের মাঠে। প্রায় গোটা তিন-চার জোড়া স্ট্যাম্প লেগে গেছে অদৃশ্য পিচে। গাছ কেটে তৈরি বিভিন্ন আকৃতির ক্রিকেট ব্যাট আর সঙ্গে টেনিস বল নিয়ে দাপাদাপি করছে ওরা। কে কার আগে ব্যাটিং করবে তাই নিয়ে হুটোপুটি। কেউ কেউ আবার ক্লাস ঘরেই টিফিনের বাটি খুলে বসে পড়েছে, সামান্য উদরপূর্তির পর নেমে পড়বে ছোঁয়াছুয়ি কিংবা বরফ-পানি খেলায়। অপেক্ষাকৃত ছোট ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা এসব খেলায় বেশি উৎসাহ পায়, বড়রা ক্রিকেট কিংবা ফুটবল খেলে।
মাত্র আধ ঘণ্টা সময়, সেটুকু উদযাপন করতেই কী বিশাল আয়োজন! বেশিরভাগ দিনই খেলা শেষ হয় না, বাকি থেকে যায় অনেকটাই। পরদিন আবার শুরু হয় আগের জায়গা থেকেই। কেউ যদি ক্লাসে না আসে তাহলে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে জায়গা দেওয়া হয়। সে না এলে আরেকজন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একটি দশ ওভারের খেলা শেষ হতে সপ্তাহ ঘুরে যায়। তবুও উৎসাহের কোনও কমতি নেই।
আজাহারের দায়িত্বে আছে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্ররা। এরা বড় দিশেহারা প্রকৃতির হয়ে থাকে। বয়সটাই এমন। ছোঁয়াছুয়ি খেলার এটাই সম্ভবত শেষ সময়, এর পর থেকেই এই খেলায় আগ্রহ আশঙ্কাজনক হাড়ে হ্রাস পায়। আবার এই বয়স থেকেই ক্রিকেট ফুটবলে নাম লেখাতে মন আঁকুপাঁকু করে। কিন্তু বড় ক্লাসের ছেলেরা ছোটদের পাত্তা দেয় না। ফলে বেশিরভাগ দিনই মখ খারাপ করে বসে থাকে কেউ কেউ। আবার খুব বেশি উৎসাহী হলে নিজেদের মধ্যেই খেলা শুরু করে। কিন্তু পরিশ্রম করে কুলিয়ে ওঠে না। বাইশ জনের খেলা না হলে মজাও কম। আর একত্রে বাইশ জন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। সীমান্তপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীতে এত ছাত্র নেই। কোনও শ্রেণীতেই নেই। তাই ওরা মিলে মিশে খেলে।
উদ্ভিদ বিদ্যায় মাস্টার্স করে শেষে গ্রামের স্কুলে এসে সাধারণ বিজ্ঞান পড়াতে আজাহারের সম্মানে লাগে। কিন্তু দেশভর চাকরির যে করুণ দশা, তাতে উপায়ই বা কি। তাছাড়া অন্য অনেক হতদরিদ্র গ্রামের মতো অবস্থায় নেই সীমান্তপুর। এখানে বিদ্যুৎ আছে, এমনকি প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে রয়েছে স্যানিটারি পায়খানার বন্দোবস্ত। এই গ্রামে মানুষের মধ্যে ধর্মভীরুতা আছে, কিন্তু কুসংস্কার নেই বললেই চলে। ভূত দেখে ভয় পাবার বিষয়টা এখন আর এদের বিচলিত করে না। তবে কিছু কিংবদন্তী গল্প লোকমুখে শোনা যায়। আজাহার এখানে এসেছেন তা প্রায় দশ বছর। দীর্ঘ সময়ে সম্মান খোয়া যাবার ব্যাপারটার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন। গ্রামের বিশুদ্ধ বাতাসে পরমায়ু নিশ্চিত হবে এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। টাকটা ফল-ফলাদি, শাক-সবজি, শস্য, কিংবা মাছ-মাংস এখানে অঢেল। অন্তত শহুরে ভেজাল খাদ্য পেটে ফেলে অনিচ্ছায় মৃত্যুর দিকে হাঁটার গতি বাড়ে না। তাছাড়া, গাছপালা এ অঞ্চলে প্রচুর। গ্রামের একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, সেখানে যাবার পথেই নাতিদীর্ঘ বন, আর একটু পশ্চিম দিকে গেলেই স্রোতস্বিনী নদীর দেখা মেলে। এক এক স্থানে এক এক ধরণের গাছের অস্তিত্ব, আজাহারের বড্ড ভাল লাগে। স্বপ্ন দেখেন একদিন উদ্ভিদের জীবন নিয়ে এমন যুগান্তকারী কিছু আবিষ্কার করবেন যে এক লাফে বিশ্ব বাজারে তার কদর বেড়ে যাবে। আমেরিকা-জাপানের মতো দেশ তাকে নিয়ে টানাটানি করবে। তিনি তখন বেঁছে নেবেন ভবিষ্যৎ। তবে গত দোষ বছরে কোনও হিল্লে হয়নি। বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ ক্রস ব্রিডিং করে নতুন প্রজাতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন, ফল হয়নি বিশেষ। এক বৃক্ষের ছাল আরেক বৃক্ষ ধারণ করতে চায় না সর্বদা। এক কাণ্ডের সঙ্গে আরেক কাণ্ড জোড়া দিতে গেলে দুটোই নির্জীব হয়ে যায়। তাছাড়া গবেষণা করার মতো উপযুক্ত যন্ত্রের যোগানও দিতে পারছেন কই? ল্যাব তৈরি করা তো এক প্রকার স্বপ্নের মতোই! যেটুকু টাকা স্কুল শিক্ষকতা করে পকেটে আসে তা খাওয়া পড়ার কাজেই সিংহভাগ বিলীন হয়। বাকিটুকু দিয়ে আর কতই বা গবেষণা সম্ভব!
তবে হাল ছাড়ার পাত্র নন তিনি। প্রায়শই মনে হয়, আর একটু, তারপরই সাফল্য ধরা দেবে হাতে।
স্কুলের টিচার্স রুমটা যৎসামান্য। তাতে ঠাসাঠাসি করে বাইশ জন শিক্ষক শিক্ষিকা বসেন। এরাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব ক্লাস নেয়। আপাতত সেখানে যেতে ইচ্ছা করছিল না আজাহার হোসেনের। তাই মাঠের এক কোণায় ঘাসের উপর বসে পড়লেন তিনি। পেছনের আম গাছের গুঁড়িতে হেলান দিলেন। এখন গ্রীষ্মকাল, আমের ফলন হচ্ছে। গাছে একগাদা কাঁচা আম ঝুলে আছে। হাত বাড়ালেই অবশ্য পাড়া যাবে না, তার জন্য গাছে উঠতে হবে। আজাহারের বয়স এখন একচল্লিশ, গাছে ওঠা তার জন্য কষ্টকর। তাছাড়া পড়লে আর দেখতে হবে না। তাছাড়া জামা কাপড়ও নষ্ট হবে। এখনও আরও চারটে ক্লাস নেয়া বাকি।
দৈনিক সাত ঘণ্টা বই পড়ার ফলস্বরূপ তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা লেগেছে। ওটা খুললেই পৃথিবী আবাছা দেখায়। তবে না খুললে আরাম লাগে না।
চশমা খুলে শার্টের পকেটে রাখলেন আজাহার হোসেন। উপরে চাইলেন। দুই একটা আম পেড়ে ফেলতে পারলে ভালই হত, ভাবলেন মনে মনে। কাঁচা আমের সরবত তার খুব প্রিয়। পোড়া লঙ্কা আর বিটলবণ দিয়ে ভাল করে বানাতে পারলে এই দাবদাহেও কলজে ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
“স্যার।”
ছাত্রের ডাকে গাছের ডাল থেকে ধরণীতে ফিরলেন তিনি। কে ডাকে? হাসেম নয়তো? হাশেম পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। ক্লাসের ফাস্ট বয়। ব্রাইট স্টুডেন্ট। ছেলেটিকে অত্যান্ত পছন্দ করেন তিনি। পুরো ক্লাসে একমাত্র এই ছেলেই হয়তো পারবে শহরে পৌঁছতে, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে। তাছাড়া গাছপালা সম্পর্কেও ওর অগাধ আগ্রহ। ভাল লাগার সেটাও একটা কারণ।
“হাশেম এসেছ?”
“জি স্যার।”
“কিছু বলবে?”
“স্যার, আপনি বলেছিলেন গাছপালার উপর একটা প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস নেবেন। বনের ওদিকটায় নিয়ে যাবেন।”
“বলেছিলাম নাকি?” মনে করার চেষ্টা করলেন আজাহার হোসেন।
“বলেছিলেন স্যার।”
“হুম, তা হলে যাব।”
“স্যার, লাটু বলছিল ওখানে নাকি বাঘ-ভালুক আছে!” চোখ বড় বড় করে বলল হাসেম।
হো হো করে হেসে উঠলেন বিজ্ঞান শিক্ষক। “বাজে কথা। অমন একটা নিরীহ বন পুরো দেশে পাবে কি না সন্দেহ।”
“রিমা বলছিল, সাপ-”
এবারে আর কথা শেষ করতে দিলেন না আজাহার। ‘সাপ? তা আছে বটে। ভেবো না। আমরা ছোট ছোট বোতলে করে কার্বলিক অ্যাসিড নিয়ে যাবো, সাপের বাবাও ওর গন্ধ পেলে ধারে ঘেঁষবে না।’
“এসিড নেব?” এসিড মানেই ভয়ংকর জিনিস সেটা হোসেনদের ক্লাসে কিছুদিন আগেই বলেছেন স্বয়ং আজাহার। বেচারা তাই নাম শুনেই বিচলিত।
“ভয় পাবার কিছু নেই। কার্বলিক এসিড অত মারাত্মক কিছু নয়,” আশ্বস্ত করলেন আজাহার। “তাছাড়া, আমরা ছোট ছোট কাঁচের শিশিতে করে নিয়ে ঢাকনায় ফুটো করে কাছে রাখব। দেখবে, কোনও ঝামেলা হবে না।”
“ঠিক আছে স্যার,” নিজেকে সামলে নিল হাশেম। হুট করে ঘাবড়ে গেছে দেখে নিজেই কিছুটা লজ্জিত। কথা ঘোরাতে বলল, “আমরা কবে যাব?”
“চলো আগামী সপ্তাহে। এই ধরো, মঙ্গলবার। আগে অন্য টিচারদের সঙ্গে কথা বলে ঐদিনের ক্লাসগুলো সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে।”
হাশেম উৎসাহী হয়ে বলল, “আমি কি তবে সবাইকে জানিয়ে দেব?”
“এখনই বোলো না। আগে ক্লাসগুলো সরানোর ব্যবস্থা হোক। আমিই জানাব। তুমি বরং আমার খেয়াল না থাকলে রবিবার মনে করিয়ে দিও। আজ তো বৃহস্পতিবার, আগামী দু’দিন স্কুল বন্ধ। আমি ভুলেও যেতে পারি ব্যাপারটা!”
“আচ্ছা স্যার, জানাব।”
হাশেম যাবার জন্য প্রস্তুত হতেই আজাহার ওকে পিছু ডাকলেন। “হোসেন, তুমি টিফিন করেছ?”
ঘুরে দাঁড়াল ছেলেটা, “জি স্যার,” জবাব দিল।
“একটা কাজ করতে পারবে?” সামান্য ইতস্তত করলেন শ্রেণী শিক্ষক।
“বলুন।”
“গাছ থেকে কয়েকটা আম পেড়ে দাও তো।”
বিপুল উৎসাহে গাছে উঠে পড়ল হোসেন। পটা পটা প্রায় এক ডজন আম পেড়ে ফেলল। আজাহার হোসেন রীতিমত ধমকে ওকে নামালেন। তারপর একগাল হেসে ধন্যবাদ দিলেন। টুকিটাকি বাজার করার জন্য ছোট্ট একটা কাপড়ের থলে ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটই রাখেন তিনি। আমগুলো সেটাতেই ভরে ফেললেন। ক্ষুদ্র ইচ্ছাটা অপূরণ থাকবে না এই ভেবে খুশি হলেন মনে মনে।
© P G Dastider. All rights reserved. Work ID: dfa27e607e1736d5